টাকা ধার দেয়ার অফুরন্ত সওয়াব | Bogura TV | বগুড়া টিভি
বগুড়া টিভি ডেস্কঃ
জীবন চলার পথে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়াটা স্বাভাবিক। তবে আল্লাহর রসুল সা. সবসময় ঋণগ্রস্ততা থেকে মুক্ত থাকতে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। রসুল সা.ও ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। ঋণ পরিশোধ করেছেন। কোনো বিনিময় ছাড়া ঋণ দেয়াকে করজে হাসানা বলা হয়। ইসলামে করজে হাসানা বা টাকা ধার দেয়া মহৎ কাজ।
ঋণ দেয়ার মাধ্যমে অন্যের প্রয়োজন পূরণ হয়, বিপদ দূর করা হয়, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। রসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার বিপদগুলো দূর করবেন। (বুখারি ২৪৪২)
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, তাদের মধ্য থেকে বারোজন সর্দার নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। যদি তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠিত কর, জাকাত দিতে থাক, আমার পয়গম্বরদের প্রতি বিশ্বাস রাখ, তাদের সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম পন্থায় করজে হাসানা দিতে থাক, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের গোনাহ দূর করে দেব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করব, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নির্ঝরণীসমূহ প্রবাহিত হয়। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এরপরও কাফের হয়, সে নিশ্চিতভাবেই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে (আল মায়িদাহ-১২)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, কে সে, যে আল্লাহকে করজে হাসানা প্রদান করবে? তিনি তার জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন। (সুরা বাকারা ২৪৫) করজে হাসানা মানে হলো, আল্লাহর সন্তুষ্ট ও সওয়াবের আশায় কাউকে নিঃশর্ত ঋণ দেয়া। তাফসিরের কিতাবে আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার এ অর্থও বলা হয়েছে যে তার বান্দাদের ঋণ দেয়া ও তাদের অভাব পূরণ করা।
আল্লাহ আরো বলেন, এমন কেউ কি আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দিতে পারে? কর্জে হাসানা (উত্তম ঋণ), যাতে আল্লাহ তা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে ফেরত দেন। আর সেদিন তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান। (সুরা হাদিদ ১১)
কোরআনের কয়েক জায়াগায় করজে হাসানা দেয়ার কথা পাওয়া যায়। এমনকি হাদিসেও এসেছে কর্জে হাসানার বিশেষ ফজিলতের কথা। হযরত আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, এক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করে তার দরজায় একটি লেখা দেখতে পেল যে সদকার নেকি ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হয় এবং ঋণদানের নেকি ১৮ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। (সিলসিলা সহিহা ৩৪০৭)
করজে হাসানার ফজিলত
রসুল সা. এর অসাধারণ একটি হাদিস আমরা পড়বো আজ। হযরত বুরায়দা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসুল থেকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো অভাবিকে (ঋণ আদায়ে) অবকাশ দিবে সে প্রতিদিন ওই পরিমাণ সম্পদ সদকার সাওয়াব পাবে, হযরত বুরায়দা রা. বলেন, অতঃপর আমি আল্লাহর রসুলকে (আবার) বলতে শুনলাম, যে ব্যক্তি কোনো অভাবিকে (ঋণ আদায়ে) সুযোগ দিবে সে প্রতিদিন উক্ত ঋণের দ্বিগুণ পরিমাণ সম্পদ সদকার সাওয়াব পাবে, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল!
আমি আপনাকে একবার বলতে শুনলাম, যে ব্যক্তি অভাবিকে (ঋণ আদায়ে) অবকাশ দিবে সে প্রতিদিন ওই পরিমাণ সম্পদ সদকার সাওয়াব পাবে। এরপর আবার বলতে শুনলাম, যে ব্যক্তি অভাবীকে (ঋণ আদায়ে) সুযোগ দিবে সে প্রতিদিন উক্ত ঋণের দ্বিগুণ পরিমাণ সম্পদ সদকার সাওয়াব পাবে। (এর ব্যাখ্যা কী?) তখন আল্লাহর রসুল বললেন, ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ঋণের সমপরিমাণ দানের সাওয়াব হবে।
অতঃপর যখন মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যাবে, কিন্তু ঋণ আদায়ে অক্ষমতা প্রকাশ করবে, তখন যদি আবার সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিদিন ডবল দানের সাওয়াব হবে। (মুসনাদে আহমাদ ২৩০৪৬)
আল্লাহর রসুল সা. বিভিন্ন সময় তার প্রিয় সাহাবিদের করজে হাসানার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। করজে হাসানার উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে রসুল সা. বলেন, কোনো একজন মুসলিম অন্য মুসলিমকে দুবার ঋণ দিলে এ ঋণদান আল্লাহর পথে সে পরিমাণ সম্পদ একবার সদকা করার সমতুল্য। (ইবনে মাজাহ ২৪৩০)
অন্য হাদিসে রসুল সা. বলেন, যে ব্যক্তি (ঋণগ্রস্ত) অভাবী ব্যক্তিকে অবকাশ দেবে, সে দানখয়রাত করার সওয়াব পাবে।
আর যে ব্যক্তি ঋণশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ও সময় বাড়িয়ে দেবে সেও প্রতিদিন দানখয়রাত করার সওয়াব পাবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪১৮) তবে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল করতে হবে যে ঋণগ্রহীতা আদৌ কোনো যৌক্তিক কারণে ঋণ নিচ্ছে কি না, অপচয় কিংবা অনৈসলামিক কাজে খরচ করার জন্য ঋণ দেওয়া উচিত নয়। ঋণগ্রহীতারও যৌক্তিক কারণ ও সময়মতো ঋণ পরিশোধের দৃঢ় বিশ্বাস না থাকলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ঋণ নেওয়া উচিত নয়। রসুল সা. অভাবীকে ঋণ দেওয়ার প্রতি যেমন উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি সময়মতো ঋণ পরিশোধের প্রতিও জোর দিয়েছেন। এমনকি তিনি নিজেও সর্বদা ঋণমুক্ত জীবনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন।
সময় মতো ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব
রসুল সা. বলেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম যে তার (ঋণের) হককে উত্তমরূপে পরিশোধ করে। (বুখারি ২৬০৬) এমনকি কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সময়মতো ঋণ পরিশোধে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শারিদ বিন সুওয়ায়দ রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে সচ্ছল ব্যক্তি কোনো দেনা পরিশোধ করতে গড়িমসি করে, তাকে অপমান ও শাস্তি দেওয়া আমার জন্য হালাল। আল আত-তানাফিসি রা. বলেন, অপমান করা অর্থ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে এবং শাস্তি দেওয়ার অর্থ তাকে জেলখানায় বন্দি করা। (ইবনে মাজাহ ২৪২৭)
কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি বাস্তবেই অক্ষম হয়, তাহলে সামর্থ্য থাকলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের। আবু হুরায়রা রা. বলেন, রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, এক ব্যক্তি লোকদের ঋণ দিত; যখন সে কোনো গরিবকে দেখত, তখন সে তার চাকরকে বলত, তাকে ক্ষমা করে দাও, হয়তো আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে আমাদের ক্ষমা করবেন। এরপর লোকটির মৃত্যুর পর আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত হলে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (নাসায়ি ৪৬৯৫)
ঋণ থেকে বাঁচতে রসুল সা. এর দোয়া
অর্থাৎ, ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই। মাছীহ দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই। জীবনের ফেতনা ও মৃত্যুর ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই। ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে গোনাহ ও ঋণ থেকে আশ্রয় চাই।
কেউ (অন্য বর্ণনায় আছে বর্ণনাকারী নিজেই) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি ঋণ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান! তিনি বললেন, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয় তখন কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে। (বুখারি ৮৩২)
অর্থাৎ, ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুঃখ-দুশ্চিন্তা থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে, ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রাবল্য (-এর শিকার হওয়া) থেকে। (বুখারি ৬৩৬৯)

No comments