শিরোনাম

বগুড়ায় ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার! ভুল চিকিৎসায় ঘটছে মৃত্যু | Bogura TV | বগুড়া টিভি


আজাদুর রহমানঃ

বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মনীতির অনুসরণ করে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

এদের অনেকগুলোর লাইসেন্সও নেই। অভিযোগ আছে, দালালের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে এসব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা দালালরা প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের তাদের পছন্দের চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করে। বিনিময়ে কমিশন পায়। এসব হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মানুষ মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে অনেকের।

বগুড়ার শেরপুর সড়কে ডলফিন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গত বছরে ১৮ জুলাই দালালের মাধ্যমে সাকিব হাসান (১৫) নামে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র ভর্তি হয়। রাতে তার অ্যাপেনডিসাইটিস অপারেশন হয়। ভুল অপারেশনের কারণে ছেলেটি মারা যায়। এ ঘটনার পর চিকিৎসক, নার্স ও ক্লিনিক মালিক পালিয়ে যান।

ভুক্তভোগীরা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই প্রভাবশালীরা যত্রতত্র ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে তুলছেন। কিছু অর্থলোভী চিকিৎসক এসব ক্লিনিকে অপচিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এসব ক্লিনিকে স্থায়ী চিকিৎসক ও নার্স নেই। নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন এসব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপারেশন থিয়েটার নেই। থাকলেও সেটা মানসম্মত নয়। রোগীর বাঁচার সম্ভবনা নেই জানার পরও শুধু টাকার লোভে ভর্তি করানো হয়। মাঝে মধ্যেই জনগণ অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন।

আলমগীর হোসেন নামে একজন জানান, তিনি তার স্বজনের চিকিৎসার জন্য দুটি ক্লিনিক ও শজিমেক হাসপাতালে পরীক্ষা করান। চিকিৎসকরা তাকে তিন ধরনের মেডিক্যাল রিপোর্ট দিয়েছেন। একজনের প্যাথলজি রিপোর্ট দেখে অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে।

জেলায় ২০৮টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। অধিক লাভের আশায় গড়ে এসব চিকিৎসা কেন্দ্রের মধ্যে ১১১টি  ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এরা স্বাস্থ্য বিভাগে রুলস্ অ্যান্ড রেগুলেশন অনুসরণ করেনা।

নিয়মানুসারে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ১০ শয্যার হাসপাতালে তিনজন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছয়জন নার্স, একজন  সার্জন, একজন গাইনোকোলজিস্ট, একজন মেডিসিন চিকিৎসক এবং একজন অ্যানেসথিয়েটিস থাকার কথা। কিন্তু ৬০ শতাংশই এসব মেনে চলে না। উপরন্তু অধিকাংশরই পরিবেশ অধিদফতরের লাইসেন্স নেই।

শহরে ২০টির বেশি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা করেছে। যেগুলোর লাইসেন্স নেই। এর বাইরে কোনও ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলে তার তথ্য সিভিল সার্জন অফিসকে অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

ক্লিনিকগুলো বর্তমানে সিজারকে পুজি করেই ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গাইনি চিকিৎসক না থাকলেও ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সহকারী ও আয়াকে দিয়েও সিজার করিয়ে নিচ্ছে ফলে শিশুর মৃত সহ মায়ের ব্যাপক শারীরিক অবনতির মতো ঘটনা ঘটছে।

এদিকে সিজারিয়ান সেকশন বন্ধের নীতিমালাগুলোকে আইনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। একইসঙ্গে জনসচেতনতা তৈরিতে নীতিমালাগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় ঘোষণা করে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ। আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাস গুপ্ত।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম গণমাধ্যমে বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের ব্যাপক প্রচারণা এবং অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধ করার লক্ষ্যে গাইডলাইনগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে এ সংক্রান্ত নীতিমালাকে আইনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাই এই নীতিমালা মানতে এখন সবাই বাধ্য।

প্রয়োজন ছাড়া প্রসূতির সিজার কার্যক্রম বন্ধে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়। ২০১৯ সালের ৩০শে জুন প্রয়োজন ছাড়া প্রসূতির সিজার কার্যক্রম রোধে নীতিমালা তৈরি করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ক্লিনিকে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রতিরোধে কার্যকর তদারকি করতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।

চীনে সিজারের হার বিশ্বের মধ্যে খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নতুন নীতিমালা প্রণয়ণের কারণে এটা কমেছে। গ্রামে-গঞ্জে যে প্রাইভেট হাসপাতালগুলো আছে সেগুলো কোনো ধরনের সরকারি মনিটরিং ছাড়াই সিজারিয়ান সেকশন করে যাচ্ছে। এটা থেকে অনেকের অমানবিক মৃত্যুও ঘটেছে। 

অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শিক্ষার্থী দিয়েও চালানো হচ্ছে কার্যক্রম। একটি সুনামধন্য ক্লিনিকের নার্সের সাথে কথা বলে জানাযায়, সে ১ বছর নার্সিং পড়াশোনা করেছেন, তবে পারিবারিক সমস্যার কারনে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি, তাই ক্লিনিকে কাজ করছেন।

চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর আলিফ জেনারেল হসপিটালে একজন রোগীর মৃত হয়, পরে হসপিটালের মালিক-কর্মচারি পালিয়ে যায়। গতমাসেও পিটিআই মোড়ে একটি ক্লিনিকে গলা টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটলে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়, সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। পরে ক্লিনিকে আসলে আশপাশের লোকজন শোনেন অপারেশনের ঘটনা।

মুহুর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে গেলে পালিয়ে যায় ক্লিনিক মালিক, আর ক্লিনিক মালিককে রক্ষা করতে জমায়েত হতে থাকে বিভিন্ন ক্লিনিকের মালিক, কর্মচারী আর দালাল। সংবাদ প্রকাশ না করতেও চাপ দেন রাজনৈতিক দলের একাধিক পদবীধারী নেতা।



এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন শফিউল আজম বলেন, আমরা এ রকম বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছি, দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

No comments