বগুড়ায় সবজির বাজারে আগুন! হাসফাসে ক্রেতারা | Bogura TV | বগুড়া টিভি
আজাদুর রহমানঃ
বগুড়ায় হাট-বাজারগুলো দখল করে নিয়েছে আগাম চাষ করা শীতকালীন সবজি। জেলার সর্ববৃহৎ মহাস্থান কাঁচা বাজারে এখন শীতকালীন সবজির বাহার সাজিয়ে ব্যাবসায়িদের নজর কাড়তে চলছে কৃষকদের নানান প্রচেষ্টা।
মানভেদে চলছে দরদাম ও বেচা-বেচা। মঙ্গলবার (৭ই নভেম্ববর) সকালে জেলার বৃহৎ মহাস্থানগড় সবজি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের বিশাল অংশজুড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ফুলকপি ও বাঁধাকপি।
একপাশে ডাটা আর অন্য পাশে শোভা পাচ্ছে সারিসারি বাঁধাকপি। বছরের এ সময়টায় সপ্তাহের শনিবার ও বুধবার হাট ছাড়াও প্রতিদিন সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলাসহ আশ-পাশের এলাকার কৃষকরা এ বাজারে তাদের জমির উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে আসেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এ হাটে সবজি কিনতে আসেন। সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক তাদের উৎপাদিত সবজি ভ্যান, ভটভটি, মিনি ট্রাকযোগে হাটে তুলতে শুরু করে।
মাঠের বিশাল অংশজুড়ে সাজিয়ে রাখা ফুলকপি। নিচে ডাটা আর ওপরে শোভা পাচ্ছিলো ফুলগুলো। স্তুপ থেকে ঝাঁঝ ছড়াচ্ছিলো কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজের। ভ্যানভর্তি মূলা যেন ফোঁকলা দাঁতের হাসি ঝরাচ্ছিলো অবিরত।
বেগুনের তো গুণেরই শেষ নেই! করলা, পেঁপে, লাউ শোভা পাচ্ছিলো সবুজের সমারোহ। সবজিগুলো ক্ষেত থেকে তুলে কৃষক সরাসরি বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে এসেছেন। তরতাজা এসব সবজির গায়ে তখনো লেগেছিলো মাটির ঘ্রাণ ও শিশিরকণা। তবে সবজির দাম যেন ক্রেতার নাগালের বাইরে।
সবজিগুলো ক্ষেত থেকে তুলে সরাসরি বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে এসেছে কৃষক। ভোর থেকে তাদের এই বিক্রির আয়োজন চলে। ক্ষেত থেকে সবজি তোলার পর ভটভটি, ভ্যান, রিকশা, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সকাল ৭টার মধ্যেই কৃষকরা সবজি নিয়ে এই বাজারে হাজির হয়।
বাজারে পা রাখা মাত্র স্থানীয়সহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা ঘিরে ধরে কৃষকদের। যে যার মতো সবজি নিয়ে বাজারের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে পাইকাররা দরদাম কষে সবজি কিনতে শুরু করেন। এভাবেই দিনব্যাপী চলে সবজি কেনা-বেচা।
বিকেল হতেই দূর-দূরান্তের পাইকারদের কেনা সবজি পণ্যবাহীতে নিয়ে ছুটে চলেন নিজ এলাকার বাজারগুলোতে। এ কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও দেখা যায়। সবজির এ বাজারে আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, ঢেঁড়স মূলা, বেগুন, মরিচ, গাঁজর, শিম, পেঁয়াজ, পালং ও লাল শাক, করলা, ঝিঙা, বরবটি, শসা, শোলকপাতা, ধনিয়াপাতা, ছাচি লাউ, মিষ্টি কুমড়া, আদা, রসুনসহ সব ধরনের সবজি পাওয়া যায়।
১৫০ টাকা কেজির আদা এখন ২৪০ টাকা এবং ১৮০ টাকার রসুন ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া ৫০ টাকা কেজির বেগুন ১০০ টাকা ও ৭০ টাকা কেজির করলা ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
সবজি, ভোজ্য তেল, ডাল, মাছ, ডিম, মুরগিসহ নিত্যপন্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে পণ্য কিনতে গরীব ও মধ্যবিত্ত মানুষদের নাভিশ্বাস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে লাগামহীন ভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম।
সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে হুহু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। ক্রেতারা হাট বাজারে নির্ধারিত টাকায় প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেনা।
দেড়শ টাকা কেজির আদা এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা কেজি, ১৮০ টাকা কেজির রসুন বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজিতে, ৬০ টাকা কেজির পোটল ৮০ টাকা, ৮০ টাকার কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা, ৭০ টাকা কেজির করলা ১২০ টাকা, ৫০ টাকা কেজির বেগুন ১০০ টাকা, দেশী জাতের পেয়াজ ৭০ টাকা কেজির স্থলে বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৭০ টাকা কেজি, চিনি ১২০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ টাকা, খাসির মাংস ১২০০ টাকা, বয়লার মুরগি ১৬০ টাকা কেজি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯০ টাকা, লাল পাকিস্তানি মুরগী ২৮০ টাকা কেজি থেকে ৩০০ টাকা, দেশী মুরগী ৪৫০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা কেজি. ৪০ টাকা এক হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকা এবং হাঁসের একহাতি ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরণের মাছ কেজিতে ৮০ টাকা থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। রুই মাছ ৩৪০ কেজি, কাতলা ৩৬০ টাকা কেজি, সিলভার কার্প ও পাঙ্গাশ মাছ ২০০ টাকা কেজি, শিংমাছ ৪০০ টাকা কেজি, দেশী মাগুর ও টেংরা ৬০০ টাকা ও গুচি মাছ ৮৫০ টাকা কেজিতে বেচাকেনা চলছে। শীতকালীন সবজি বাজারে আমদানি হলে কিছুটা দাম কমতে পারে। তবে মাছ ও মাংসের দাম কমার কোন সম্ভাবনা নেই।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা এখানে নিয়মিত আসেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে বড় পাইকাররাও কেনাকাটার জন্য এ মোকামের ওপর নির্ভরশীল।
বগুড়া জেলার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী মহাস্থানগড় কাঁচা বাজার সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম। তাই সবসময়ই মহাস্থানগড় বাজারে পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকে। আবহাওয়া উপর শীতকালীন সবজির আবাদ নির্ভর করে। এবার মোটামুটি আবাদ ভালো হয়েছে। বাজারেও সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
দামও বেশ ভালো। সবমিলিয়ে এ মোকামে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ সবজির আমদানি ঘটাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
শীতকালীন আগাম সবজিতে কৃষকের পাশাপাশি তারাও বেশ লাভবান হয়ে থাকেন। শীতের শেষ ভাগে তেমন লাভের মুখ দেখতে পান না বলেও মন্তব্য করেন তারা। বগুড়া জেলায় আগাম চাষাবাদের শীতকালীন নানান সবজি রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন তারা।
শহরের খুচরা বাজারের সবজি বিক্রেতা জানান, তারা নিয়মিত ভাবে মহাস্থান বাজার থেকে পাইকারি সবজি কিনে থাকেন। এ হাটে চাহিদা মতো প্রায় সব ধরনের টাটকা তরতাজা সবজি পাওয়া যায়।
বর্তমানে আগাম চাষাবাদের সবজিতে বাজারগুলো ভরে উঠেছে। বাজার মূল্য ভাল থাকায় এ ফলনে কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন।
এ বিষয়ে রাজাবাজার আরৎদার মালিক সমিতির সহ-সাধারন সম্পাদক ও মদিনা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাফায়াতুল ইসলাম বাবু জানান, বন্যার কারণে বীজ নষ্ট হয়েছে, তাই অনেক ফসল নষ্ট হবার কারনে উৎপাদন কম হয়েছে। তবে গত সপ্তাহের তুলনায় সবকিছুর দাম একটু কমেছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরো বাজার কমে আসবে।

No comments