শিরোনাম

কালাইয়ে ভন্ড কবিরাজের ‘ফু’ দিয়ে চলে সর্বরোগের চিকিৎসা,হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা | Bogura TV | বগুড়া টিভি


রকিবুল হাসান, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ

তোফাজ্জল পাগলা দু’বছর আগেও তাকে এলাকার সবাই এই নামেই চিনতো। আজ তিনি বনে গেছেন তোফাজ্জল কবিরাজ। এ সুবাদে প্রতিদিন তার বাড়ীতে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। ঔষুধ বা পানি কিছুই না, তিনি শুধু ‘ফু’ দিয়েই জটিল ও কঠিন রোগসহ নানা রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফি নয়, পীরের আস্তানায় ওরসের কথা বলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তিনি হলেন, জয়পুরহাটের কালাই উপজলার উদয়পুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন।

নর-নারীকে সামনে নিয়ে দোয়া পড়ে ফু দিয়ে প্রায় ২ বছর ধরে সর্বরোগের চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছেন এই ভন্ড কবিরাজ। তার বাড়ীতে প্রতিদিন গড়ে ৮’শ থেকে এক হাজার লোকের সমাগম হয়। আর শুক্রবার হয় ৮ থেকে ১০ হাজার লোকের উপস্থিতি। এতে প্রতিদিন গড়ে একেক জন ৫০ টাকা করে হলে ৫০ হাজার এবং প্রতি শুক্রবার কমপক্ষে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তবে রোগীরা নিচে ২০ আর উপরে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দান করেন। রোগীরা সিলভারের একটি পাতিলে এসব টাকা ফেলে দেন।     

শুক্রবার (৮ ডিসেম্বর) দুপুরে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কিচক-মোসলেমগঞ্জ সড়কে নুনুজ বাজারের পশ্চিম পাশে শ্রীপুর গ্রাম। নুনুজ বাজার থেকে তার বাড়ী পর্যন্ত মানুষের ভীড়। সবাই কবিরাজের সামনে দাঁড়ানোর জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন। 

এদিকে কবিরাজ তোফাজ্জল পাগলা সাদা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি ও মাথায় টুপি পড়ে চেয়ারে বসে আছেন। আর তিন পাশে বসে আছেন তার কয়েকজন লোক। সামনে রোগীরা দাড়িয়ে আছেন, ফু দিচ্ছেন কবিরাজ। রোগীরা পীরের আস্তানায় ওরসের জন্য একটি সিলভারের পাতিলে টাকা ফেলে দিচ্ছেন এবং তোফাজ্জলের পা ধরে সালাম করে চলে যাচ্ছেন। এরপর কবিরাজের লোকজন পাতিলের টাকাগুলো ভাজ করে বান্ডিল করছেন। এভাবেই চলছে ভন্ড কবিরাজ তোফাজ্জল পাগলার চিকিৎসা। 

ভন্ড কবিরাজের ছেলে ও রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তোফাজ্জল পাগলা একই জেলার পাঁচবিবি উপজেলার উত্তর সরাইল গ্রামর পীর হেলাল ও বেলাল বাবার মুরিদ। তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে সেখানে যাতায়াত করেন। দু’বছর আগেও তিনি পাগল ছিলেন। এরপর পীর বাবার দোয়ায় তিনি ভালো হন। গত দু’বছর ধরে তিনি পীর বাবার আর্শিবাদে বাড়ীতে বসে এমন চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। ফু দিয়ে তিনি ডায়াবেটিস, কিডনি, ব্যাথাসহ জটিল ও কঠিন রোগ ভালো করছেন। এ সবই পীর বাবার দোয়াই। তিনি চিকিৎসা বাবদ কোনো টাকা নেন না। তবে পীরের আস্তানায় ওরসের জন্য যে যা পারেন তাই পাতিলে ফেলে যান। 

তবে স্থানীয়রা জানান, তোফাজ্জল ছিল পাগলা। সে কিভাবে কবিরাজ হয়। তার এসব ভন্ডামি ছাড়া কিছুই না। সে বিভিন্ন এলাকায় দালাল সেট করেছে। তাদের মাধ্যমে সর্বরোগের চিকিৎসার কথা প্রচার চালাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নিজেরাই তার নিকট থেকে চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলেও প্রচার করছেন। এসব কথা শুনে বিশেষ করে গাইবান্ধার গোবিন্দগন্জ, পলাশবাড়ী ও বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজলার সহজ-সরল মানুষগুলো ছুঁটে আসেন তোফাজ্জল পাগলার কাছে। তার রোগীদের বেশিরভাগই মহিলা। সুযোগ বুঝে পীরের কথা বলে তিনি টাকা হাতিয়ে নেন। 

স্থানীয় বাসিন্দা সলিম মিয়া বলেন, কবিরাজ তোফাজ্জল একজন ভন্ড ও প্রতারক। সে পীরের দোহায় দিয়ে অপচিকিৎসা চালিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। তবে এলাকার কোন মানুষ তার প্রতারণার ফাঁদে পা দেননি। যারা এখানে আসেন তাদের অধিকাংশই গরিব। সে শুক্রবার দিনও নামাজ পড়ে না। তাহলে সে কিসের ফু দিয়ে চিকিৎসা দেন। প্রতিদিনই দুর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তোফাজ্জল পাগলা। 

সাইফুল ইসলাম নামে আরেক ব্যাক্তি বলেন, সে সবাইকে ম্যানেজ করে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তা না হলে প্রশাসনের লোকেরা এই বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেন। দিনদিন এই ভন্ড আরো বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে, সাথে ছেলেরাও জড়িত আছে টাকার লোভ কার নেই। 

চুমকি আক্তার নামে এক তরুণী জানান, অন্যের কাছে শুনে আমি একটি সমস্যা নিয়ে কবিরাজের কাছে এসেছি। তিনি আমাক ফু দিয়ে বলেছেন ভাল হয়ে যাবি তাই চলে যাচ্ছি। দরবার ওরসের জন্য এক’শ টাকা পাতিলে দিয়েছি আমাকে আরও দুইবার আসতে হবে। 

কবিরাজের ছেলে খায়রুল ইসলাম বলেন, বাবার চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সবাই আরগ্য পেয়েছে। এজন্য দিনদিন রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে, রোগীরা যে টাকা দেয় তা পীরের দরবারে দেওয়া হয়। 

ভন্ড কবিরাজ তোফাজ্জল বলেন, পীর বাবার অছিলায় আজ আমি পাগল থেকে কবিরাজ হয়েছি। জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা দিচ্ছি, সবাই আমার চিকিৎসা নিয়ে ভালো হচ্ছে। প্রতিদিন রোগীদের সংখ্যা বেড়েই চলছে, টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যে যা দেয় তা হাত দিয়েও ধরিনা। পাতিলে ফেলে যায়। আর সেই টাকা পীরের দরবারে পাঠিয়ে দেই। 

তবে এ বিষয়ে উত্তর সরাইলের পীর হেলাল উদ্দিনের সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযাগ করা হলে ফোন রিসিভ করেননি।  

কালাই উপজলা নির্বাহী অফিসার জান্নাত আরা তিথি বলেন, আসলে এ বিষয়ে আমার জানা নেই, খোঁজ নিয়ে ওই কবিরাজের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

No comments